
ডেস্ক রিপোর্টঃ মোঃ ওমর ফারুক
দশ বছর আগে যে স্টেডিয়ামে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়ে ভক্তদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ করেছিলেন মেসি, অবসর ভেঙে সেই মেট লাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল ভক্ত-সমর্থকরা। ১৯৭৮ বিশ্বকাপ জয়ী আর্জেন্টিনা অধিনায়ক মারিও কেম্পস হাতে সোনালী রঙের ট্রফি উচুঁ করে ধরে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে মেসি এন্ড কোং-কে দিয়েছেন অনুপ্রেরণা। দারুণসব রেকর্ড নিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনাল মঞ্চে সব আলোটাই পড়েছে মেসিদের উপরে। জিতলে উপর্যুপরি ২ বার বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ডে ইতালি ( ১৯৩৪, ১৯৩৮)-ব্রাজিলের (১৯৫৮,১৯৬২) সঙ্গী হবে আর্জেন্টিনা। ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ী আর্জেন্টিনার নায়ক মেসির হাতে উপর্যুপরি দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ট্রফির দিকেই ছিল সমর্থকদের চোখ। তবে কিক অফের আগে স্পেন ফুটবলের রেনেসাঁর প্রতিনিধি ইনিয়েস্তার হাতে স্বর্নালী ট্রফিটাই একটু বেশি উজ্জীবিত করেছে নতুন স্পেনকে। আর্জেন্টিনার নেগেটিভ কৌশলের ফুটবলকে হতভম্ব করে উপর্যুপরি আক্রমনে সুফল তুলে নিয়েছে স্পেন। অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচে খেলার ১১৬তম মিনিটে ফেরান টোরেসের গোলে (১-০) ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের ট্রফি পুনরুদ্ধার করেছে স্পেন।
এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রতিটি জয়ে একক কৃতিত্ব রাখা মেসিকে বোতলবন্দি করে রাখার কৌশলে জিতেছেন স্পেন কোচ। লা লিগায় ক্যারিয়ারের অধিকাংশ সময়ে খেলেছেন মেসি। সে কারণেই স্পেন কোচ লা ফুয়েন্তে এবং তাঁর শিষ্যরা মেসির কৌশলটা ভালই জানেন। মেসিকে আটকে রাখার কৌশলে এদিন পুরোপুরি সফল স্পেনের ডিফেন্স।
৪-৪-২ ফরমেশনে আর্জেন্টিনার দুই ফরোয়ার্ড মেসি-আলভারেজ স্পেন ডিফেন্ডারেদের কড়া মার্কিংয়ে থাকায় শুরু থেকেই নিষ্ক্রিয় ছিলেন। স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের উপস্থিতির সঙ্গে পেরে না উঠলেও খেলার নিয়ন্ত্রনটা কিন্তু ছিল স্পেনের। আশ্চর্য হলেও সত্য, ১২০ মিনিটে খেলার নিয়ন্ত্রন ৬৫% নিয়ে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে খেলেছে স্পেন। আশ্চর্য হলেও সত্য,স্পেনের গোলপোষ্ট লক্ষ্য করে একটি মাত্র শট নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা। অথচ, টার্গেটে ১২টি শট নিয়েছে স্পেন।
বিপরীতে ৪-২-৩-১ ফরমেশনে পরিচিত টিকিটাকা ফুটবল প্রদর্শনীই করেছে স্পেন পুরো ম্যাচে। নিজেদের পায়ে অধিকাংশ সময়ে বলের নিয়ন্ত্রন নিয়ে ওয়ান টাচে পাস দিয়ে আর্জেন্টিনা ফুটবলারদের ক্লান্ত করতে চেষ্টা করেছে স্পেন ফুটবল দল। স্পেনের ৭৬২টি পাসের বিপরীতে আর্জেন্টিনার পাস সংখ্যার সমষ্টি মাত্র ৩৫৮। এটাই ফাইনালে স্পেনের একতরফা খেলার স্বাক্ষ্য দিচ্ছে।
প্রথমার্ধে দুটি পরিকল্পিত আক্রমনের দুটিই করেছে স্পেন। উইং অ্যাটাকে বর্তমানের সেনসেশন ইয়ামাল খেলার ৫মিনিটের মাথায় বিপজ্জনকভাবে ডি বক্সে ঢুকে পড়ে মিডফিল্ডার ওলমোকে দিয়েছিলেন পাস। সেই পাস পেয়ে ওলমো থ্রু বাড়িয়েছিলেন ইয়ামালকে। তবে ইয়ামাল বলটি নিয়ন্ত্রণে নিলেও আর্জেন্টিনা ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্টিনেজ এবং এমিলিয়ানো মার্টিনেজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বলটি বিপদমুক্ত হয়।
খেলার ৩৯তম মিনিটে স্পেনের পরিকল্পিত আক্রমনে বড় বিপদের আলামত ছিল। লাপোর্তে, রদ্রি এবং বায়েনার দারুণ বোঝাপড়ায় আক্রমন থেকে ফাবিয়ান পাস পেয়ে ডি বক্সে ঢুকে পড়া ওইয়ারজাবালের দিকে বলটি ঠেলে দেন। বক্সের কোনা থেকে বাঁ-পায়ের জোরালো শট নিয়েছিলেন তিনি। তবে আর্জেন্টিনা গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ শুয়ে পদে বলটি বিপদমুক্ত করেন। প্রথমার্ধে মেসি ১৫বার বলে টাচ করেছেন। তবে হাইড্রেশন ব্রেকের আগে একবার গোলের উৎস তৈরি করে দিয়েছিলেন মেসি। খেলার ২২ মিনিটের মাথায় আর্জেন্টিনার অধিনায়ক বক্সের প্রান্তে থাকা গঞ্জালেজের দিকে একটি চমৎকার বল বাড়িয়ে দেন, কিন্তু তিনি বলের নিয়ন্ত্রণ ঠিকমতো করতে পারেননি। ১৯ বছর আগে যে ছেলেটিকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন মেসি, সেই ইয়ামালের শৈল্পিক ফুটবল, ড্রিবলিংয়ে ভবিষ্যতের মেসির ক্লোন দেখতে পেয়েছে বিশ্ব। ৮৬ বার বলে টাচ করে প্রতিবারই আর্জেন্টিনার গোলসীমায় বিপজ্জনকভাবে ঢুকেছেন ইয়ামাল।
ডিফেন্ডার কুবার্সি-পোরো-লাপোর্তের তৈরি করা দেয়াল ভাঙতে পারেনি আর্জেন্টিনা প্রথমার্ধে। ডিফেন্সিভ মিড ফিল্ডারের ভুমিকা পালন করতে ওভারল্যাপ করে লেফট উইংয়ে বার বার চলে গেছেন স্পেনের পরিশ্রমী ফুটবলার কুকুরেয়া।
দ্বিতীয়ার্ধেও হাইড্রেশন ব্রেকের আগে খেলার নিয়ন্ত্রন ছিল স্পেনের। পরিচিত স্ট্র্যাটেজি ছেড়ে আর্জেন্টিনা এই পর্বে ডিফেন্সে দিয়েছে বেশি মনযোগ। তারপরও স্পেনের আক্রমনে বার বার ডিফেন্স এলোমেলো হয়েছে। খেলার ৬৪ মিনিটের মাথায় স্পেন ডান দিক দিয়ে সুন্দরভাবে আক্রমণ শানায়। পেদ্রি বক্সের কোনায় থাকা ওলমোকে দিয়েছিলেন পাস। সেই পাস পেয়ে জটলার মধ্যে ওলমোর নেয়া জোরালো শট আর্জেন্টিনা গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ কর্নারের বিনিময়ে প্রতিহত করেন।
খেলার ৭৭ মিনিটের মাথায় ক্রস থেকে স্পেনের পেদ্রি গোল করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু তার শটটি সৌভাগ্যবশত এমিলিয়ানো মার্টিনেজের হাতে গিয়ে পড়ে। পরের মিনিটে ইয়ামাল দ্রুতগতিতে দৌড় আর্জেন্টিনা ডিফেন্ডার মেদিনা আটকে দিলেও ক্লিয়ার করতে পারেননি। ফিরতি বলটিতে কুবার্সি নিয়েছিলেন জোরালো শট। এমিলিয়ানো মার্টিনেজ কর্নারের বিনিময়ে তা প্রতিহত করেন।
ইনজুরি টাইমের তৃতীয় মিনিটে (৯০+৩) ফার্নান্দেজ একটি আলগা বলের পেছনে ছুটতে গিয়ে কুবার্সির সাথে সজোরে ধাক্কা খান এবং সাথে সাথেই মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন! ম্যাচের শুরুতে অভিনয়ের জন্য হলুদ কার্ড দেখানো হয়েছিল! আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজকে দ্বিতীয়বারের মতো হলুদ কার্ড দেখিয়ে ( লাল কার্ড) মাঠ থেকে বহিষ্কৃত করেন রেফারি।
নির্ধারিত ৯০ মিনিট পেরিয়ে ইনজুরি টাইমের ৬ষ্ঠ মিনিটে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে নেয়া স্পেন সেনশেসন ইয়ামালে ফ্রি কিক বাঁ দিকে লাফিয়ে কর্নারের বিনিয়মে সেভ করেন আর্জেন্টিনা গোলরক্ষক মার্টিনেজ।
খেলোয়াড় পরিবর্তনের সুফল পেয়েছে স্পেন। ওয়েরজাবালের জায়গায় ফেরান টোরেস, অ্যালেক্স বাইনারের জায়গায় নিকো উইলিয়ামস, দানি ওলমোর জায়গায় মিকেল মেরিনোকে মাঠে নামালে আক্রমরে ধার বাড়ে স্পেনের।
১০ জনের আর্জেন্টিনার বিপক্ষে স্পেন আক্রমনের ধার বাড়িয়েছে। খেলার ৯৩ মিনিটের মাথায় পেদ্রির বক্সে পাঠানো চমৎকার পাস থেকে বদলি খেলোয়াড় উইলিয়ামসের দুর্দান্ত ফ্লিক আর্জেন্টিনা গোলরক্ষক মার্টিনেজ শুণ্যে লাফিয়ে বিপদমুক্ত করেন। খেলার ৯৬তম মিনিটে উইলিয়ামসের শট জালে জড়িয়েছিল। তবে ডি বক্সে মেরিনো ওটামেন্ডিকে ফাউল করায় রেফারি গোলটি বাতিল করে দেন!
অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে (১০৬ মিনিট) কাঙ্খিত গোল পায় স্পেন। খেলা পুনরায় শুরু হওয়ার মাত্র ৩৭ সেকেন্ডের মধ্যেই, নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে স্পেন ডান দিক দিয়ে দারুণভাবে আক্রমণ থেকে পোরোরের ক্রসে উইলিয়ামস বলটি নিয়ন্ত্রণে এনে ফেরান তোরেসকে দিয়েছে ব্যাকপাস। সেই পাস থেকে জোরালো শটে গোল করেন ফেরান তোরেস (১-০) থেকে তোরেস সজোরে বল জালে জড়িয়ে দিলে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপ জয়ের পথে এগিয়ে যায় স্পেন।
পুরো খেলায় আর্জেন্টিনা মাত্র একবার গোলের সুযোগ তৈরি করতে পেরেছে। এবং তা একেবারে শেষ মুহূর্তে। মেসির কর্নার থেকে সিমিওনের শট ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে গেলে টাইব্রেকার ভাগ্যে গড়ায়নি ফাইনাল।
ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর্জেন্টিনা গোলরক্ষক ১১টি সেভ করেছেন – যা বিশ্বকাপের ফাইনালে যেকোনো গোলরক্ষকের করা রেকর্ডে (১৯৬৬ সাল থেকে) যৌথভাবে সর্বোচ্চ। ফাইনালে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ড্রিবলিংয়ে রেকর্ড করেছেন স্পেন সেনসেশন ইয়ামাল। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে মেসির ৭ টি ড্রিবলিং এখনও রেকর্ড। তবে তাঁর পরের রেকর্ডটি এখন ইয়ামালের। বিশ্বকাপের ফাইনালে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ৫টির বেশি ড্রিবল সম্পন্ন করেছেন ইয়ামাল। এই রেকর্ড সঙ্গে নিয়েই শুরু হলো স্পেনের নতুন রূপকথা।