
কেপ ভার্দের এই স্বপ্নযাত্রার নেপথ্যে মাঠ ও মাঠের বাইরে সবচেয়ে বড় তারকা ভোজিনিয়া। ৪০ বছর বয়সী অখ্যাত এই গোলকিপার স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই পুরো দুনিয়াকে নিজেকে চিনিয়েছেন তার অতি মানবীয় পারফরম্যান্স দিয়ে। একের পর এক আক্রমণ রুখে দিয়ে হতাশায় স্প্যানিশদের হতাশায় ফেলে দেন তিনি। পুরো ম্যাচে ৭টি সেভ করে ম্যাচের সেরাও নির্বাচিত হন ভোজিনিয়া।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আজ ৮টি সেভ করে এবারের বিশ্বকাপে নিজের মোট সেভের সংখ্যা ১৮-তে নিয়ে গেছেন ভোজিনিয়া। চলতি টুর্নামেন্টে তার চেয়ে বেশি সেভ করেছেন শুধু কুরাসাওয়ের এলোয় রুম (২০) এবং প্যারাগুয়ের অরল্যান্ডো গিল (১৯)।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ৪০ বা তার বেশি বয়সী গোলকিপারদের মধ্যে কেবল পিটার শিলটন (১৯৯০ সালে ইংল্যান্ডের হয়ে ২৮টি) এবং দিনো জফ (১৯৮২ সালে ইতালির হয়ে ২৭টি) এক টুর্নামেন্টে এর চেয়ে বেশি সেভ করতে পেরেছেন।
পরিসংখ্যান যে সবসময় মাঠের আসল গল্প বলতে পারে না—তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ কেপ ভার্দের এবারের বিশ্বকাপ অভিযান। টুর্নামেন্টে তারা কোনো ম্যাচ জেতেনি, অথচ তাদের পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো।
সাবেক চ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়ের সঙ্গে ড্র এবং সৌদি আরবকে রুখে দিয়ে কেপ ভার্দে জায়গা করে নিয়েছিল শেষ ৩২-এ। এমন দুর্দান্ত পারফরম্যান্স কি দলটির সমর্থকরা কখনো কল্পনা করতে পেরেছিল?
এরপর আজ নকআউট পর্বে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচটিকে তারা টেনে নিয়েছে অতিরিক্ত সময়ে। ঘড়ির কাটায় ১১১তম মিনিট, ম্যাচ তখন ২-২ সমতায়, মনে হচ্ছিল পেনাল্টি শুট আউট নির্ধারণ হবে ম্যাচের ফল কিন্তু ভাগ্য সহায় হলো না কেপ ভার্দের। বোর্গেসের আত্মঘাতী গোলে আবারও এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। শেষ পর্যন্ত এই গোলেই ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণ করে দেয়।
ফলাফলে লেখা থাকবে কেপ ভার্দেকে ৩-২ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু পুরো বিশ্ব ইতিমধ্যেই দেখেছে আফ্রিকার এই দ্বীপরাষ্ট্রের লড়াকু মানসিকতা। বারবার পিছিয়ে পড়েও চোখে চোখ রাঙিয়ে কেপ ভার্দে কিভাবে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে।
এক ম্যাচে ৮টি সেভ করে নতুন আফ্রিকান রেকর্ডও গড়েছেন ভোজিনিয়া। ২০১৪ বিশ্বকাপে জার্মানির বিপক্ষে আলজেরিয়ার রাইস এম’বোলহির পর নকআউট পর্বে কোনো আফ্রিকান গোলকিপারের এটি সর্বোচ্চ সেভের কীর্তি।
২০১০ সালের চ্যাম্পিয়ন স্পেন, দুইবারের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে এবং বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা—সবার বিপক্ষেই চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছে কেপভার্দে। পুরো টুর্নামেন্টে তারা ৪টি গোল করেছে, হজম করেছে ৫টি, ৩টি ম্যাচ ড্র করেছে এবং মাত্র ১টিতে হেরেছে।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ৬৭ নম্বরে থাকা কেপ ভার্দে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চমক। অথচ দেশটির মাত্র ৪,০৩৩ বর্গ কিলোমিটার, জনসংখ্যা মাত্র পাঁচ লাখ উনত্রিশ হাজার।
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে খেলতে নেমে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিল কেপ ভার্দে। ম্যাচের শুরুতেই রায়ান মেন্ডেস আর্জেন্টিনার রক্ষণকে বেশ ভালোই পরীক্ষা নেন। তবে ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় লাতিন আমেরিকার জায়ান্টরা।
ম্যাচের ৩১ মিনিটে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের পাস থেকে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দুর্দান্ত এক শটে বল জালের ছাদে পাঠান লিওনেল মেসি। এটি ছিল টুর্নামেন্টে তার সপ্তম গোল।
প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও বিরতির পর বদলে যায় কেপ ভার্দে। মেন্ডেসের পাস থেকে ডেরয় ডুয়ার্তে কঠিন কোণ থেকে দারুণ ফিনিশিংয়ে গোল করে দলকে ১-১ সমতায় ফেরান। এটি ছিল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কেপ ভার্দের ইতিহাসে প্রথম গোল।
নির্ধারিত সময়ে আর কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ৯২ মিনিটে কর্নার থেকে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ গোল করে আর্জেন্টিনাকে আবারও এগিয়ে নেন। পিছিয়ে পড়েও দমে যায়নি কেপ ভার্দে। ১০৩ মিনিটে সিডনি লোপেস কাবরাল এক বাঁকানো শটে গোল করে ম্যাচ আবার ২-২ সমতায় আনেন।
১১১ মিনিটে মেসির নেওয়া কর্নার থেকে রোমেরো জোরালো হেড করেন, যা কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার দিনেই বোর্গেসের গায়ে সামান্য লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়ায়। এই আত্মঘাতী গোলেই ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে ফ্রি-কিক থেকে লোপেস কাবরালের একটি বুলেট গতির শট অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দেন আর্জেন্টিনার গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। নাহলে ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়াত। এই সেভের মাধ্যমেই আর্জেন্টিনার শেষ-১৬ নিশ্চিত হয়।
বিদায় নিলেও বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয় জয় করে মাথা উঁচু করেই মাঠ ছেড়েছে কেপ ভার্দে। সেই সঙ্গে বিশ্ব চিনেছে ভোজিনিয়া নামের এক লড়াকু বীরকে।